বাংলাদেশ, রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

মামা-ভাগনে মিলে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের দোকান দখল

NewsPaper

নিজস্ব প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট, ২০২৫, ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

মামা-ভাগনে মিলে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের দোকান দখল

রাজশাহীর প্রাচীন জনকল্যাণমূলক সংগঠন রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন-এর ভবনের দোকান দখলের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বিএনপি নেতা মাঈনুল হক হারু ও তার ভাগনে আশিকুল আলম ওরফে লিটুর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ। মাঈনুল হক রাজশাহী মহানগর যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি। বর্তমানে তিনি রাজশাহী জেলা মিশুক-সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি।

দুই মামা-ভাগনের বাড়ি নগরের ষষ্ঠিতলা এলাকায়। মামার শেল্টারে ভাগনে আশিকুল ইসলাম দোকান ঘরটি দখল করেছেন বলে অভিযোগ। এছাড়া তিনি ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে একটি টিন দিয়ে ঘর করে ভাড়া দিয়েছেন। অ্যাসোসিয়েশন ভবন থেকে বাইরের ব্যবসায়ীদের বিদ্যুতের সংযোগ দিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা তোলা হয়।

নগরের অলকার মোড়ে ১৮৭২ সালের ২১ জুলাই রাজশাহী অ্যাসোসিয়শনের প্রতিষ্ঠা হয়। প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সভাপতি ছিলেন দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়বাহাদুর। প্রথম সেক্রেটারি করচমাড়িয়ার জমিদার ও ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকারের বাবা রাজকুমার সরকার। এখন পদাধিকারবলে সংগঠনের সভাপতি জেলা প্রশাসক। আর সহসভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)।

রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের বহু জনকল্যাণমুলক কাজ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম ‘রাজশাহী টাউন হল’ স্থাপন, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর স্থাপনে সহযোগিতা প্রদান, ‘বসন্তকুমার এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ (১৯৩৬) স্থাপনে ভূমিকা পালন, রাজশাহী শহরে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহের লক্ষ্যে পানির কল স্থাপনের বন্দোবস্তকরণ (১৯৩৭)। এছাড়া সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। ‘রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন’-এর এক সাহিত্যসভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘শিক্ষার হেরফের’ শীর্ষক প্রবন্ধটি পাঠ করেন (১২ নভেম্বর ১৮৯২)। ১৯৯৮ সালের ২৩ জুলাই ‘রাজা প্রমদানাথ টাউন হলে’ রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন-এর ১২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। এই হলেই ১৯২৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর কাজী নজরুল ইসলাম বক্তৃতা করেছিলেন।

আশিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অ্যাসোসিয়েশন ভবনের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতৃত্বও দখল করেছেন তিনি। আশিকুল যে দোকানটিতে নিজের চেম্বার করেছেন সেটি মনোয়ারা বেগম নামের এক নারীকে বরাদ্দ দিয়েছিল অ্যাসোসিয়েশন। এ জন্য মাসে মাসে ভাড়া দিতে হতো। মনোয়ারার স্বামী আবদুল ওয়াদুদ দারা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী। জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় হিসেবে তিনি এটি ব্যবহার করতেন। আশিকুলের দাবি, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মনোয়ারার কাছ থেকে তিনি দোকান নিয়েছেন। তবে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন বলছে, সে সুযোগ নেই। এটির মালিক তারা।

গত রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই দোকান ঘরটি খোলা। ভেতরে টেলিভিশন চলছে, কিন্তু কেউ নেই। ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে একটি টিন দিয়ে ঘর করে রংমিস্ত্রিদের ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, দোকানটি এখন আশিকুলের চেম্বার। আর নিচের টিনের ঘরটি তিনিই করে ভাড়া দিয়েছেন। আশিকুল অ্যাসোসিয়েশন ভবনের বিদ্যুতের লাইন বাইরের দোকানে দিয়েছেন এবং ভাড়া নিচ্ছেন। তাঁর সহযোগী হিসেবে প্রশান্ত নামের আরেকজন আছেন।

আশিকুল আলম আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। একাধিক ছবিতে দেখা যায়, মেয়র লিটন তাঁর মুখে মিষ্টি তুলে দিচ্ছেন, আশিকুল আবার মেয়র লিটনকে ফুলের তোড়া উপহার দিচ্ছেন। তাকে লিটনের পোস্টারও লাগাতে দেখা গেছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তিনি মামা মাঈনুল হকের শেল্টারে আছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে আশিকুল আলম লিটু দাবি করেন, তিনি ব্যবসায়ী সমিতির নেতা হিসেবে এক নম্বর দোকানে চেম্বার করেছেন। 


এটি দলীয় চেম্বার নয় এবং কোনো সাইনবোর্ডও দেওয়া হয়নি। দোকানটি মালিকের কাছ থেকে লিখে নেওয়ার দলিল আছে বলেও দাবি করেন। তবে তিনি চুক্তিপত্র দেখাতে চাননি। ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে ঘর করে ভাড়া দেয়া এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বাইরে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

ব্যবসায়ীরা জানান, এক নম্বর দোকানটি দীর্ঘদিন ভাড়া না দেওয়ার কারণে বর্তমানে অ্যাসোসিয়েশনের মালিকানায় রয়েছে। এটি কাউকে ভাড়া দেওয়ার এখতিয়ার নেই। কারও কাছে হস্তান্তর করারও সুযোগ নেই। কিন্তু আশিকুল সবই করছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সদস্যদের বাদ দিয়ে জোর করে অ্যাসোসিয়েশন মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন।

রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শিক্ষাবিদ তসিকুল ইসলাম রাজা বলেন, ‘এক নম্বর দোকান এখন অ্যাসোসিয়েশনের মালিকানাধীন। এটি কাউকে ভাড়া দেওয়া হয়নি। নিচের জায়গায় ঘর করার অনুমতিও কাউকে দেওয়া হয়নি। এগুলো জোর করেই করা হয়েছে।’

রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা অ্যাসোসিয়েশন ভবন পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

আশিকুল ইসলামের মামা বিএনপি নেতা মাঈনুল হক হারু বলেন, ৫ আগস্ট এই দোকানটি লুট হয়ে যাচ্ছিল। অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছিল। তারা রক্ষা করেছেন। তখন কেউ এগিয়ে আসেননি। মনোয়ারা তাদের বলেছেন, তাদের হেফাজতে থাকলে এটি ঠিক থাকবে। তাই তাদের দেওয়া হয়েছে। এটি সংগঠনের সম্পত্তি। জেলা প্রশাসন অবৈধ মনে করলে ব্যবস্থা নেবে। জেলা প্রশাসন যেভাবে চাইবে, তারা সেভাবে তাদের সহযোগিতা করবেন