ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় দেড় দশকের মমতা শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন কম্পন সৃষ্টি করেছে। প্রথমবারের মতো মোদি-অমিত শাহর দল পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, বিশেষ করে তিস্তা ইস্যু ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে নানামুখী বিতর্ক ও গভীর পর্যবেক্ষণ। খবর বিবিসি বাংলার।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান কৌতূহল ও উদ্বেগের জায়গা হলো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা এবং পুশ-ব্যাক ইস্যু। এতোদিন তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জীর বিরোধিতা ছিল প্রধান বাধা। এখন সেই বাধার অপসারণ হলেও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত কঠোর অবস্থান নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দলই আশঙ্কা করছে, বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) চেষ্টা সামনে আরও বাড়তে পারে কিনা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের বাংলাদেশ কেন্দ্রিক মন্তব্যগুলো ছিল দুঃখজনক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তৃণমূলকে সরানোর জন্য বিজেপি ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে যে ধরনের কার্যক্রম চালিয়েছে, তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি হিসেবেই তারা মনে করছেন। দীর্ঘ সীমান্তের কারণে এই পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ার সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিজেপির জয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরাসরি কোনো প্রভাব না দেখলেও তাদের ‘হিন্দুত্ববাদী ও সাম্প্রদায়িক’ আদর্শ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ভারত ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও সেখানে মুসলিম নিগ্রহের ঘটনা দেখা যায়। এছাড়া তার বড় অভিযোগ বিজেপি সরকার শেখ হাসিনাকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়ে তাকে নতুন করে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ করে দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই নির্বাচনকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি প্রতিবেশী হিসেবে পারস্পরিক ন্যায়পরায়ণতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, যারাই ক্ষমতায় থাকুক, দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাদেরই। সাধারণ মানুষ যেন এই সম্পর্কের সুফল পায়, সেটিই প্রধান কাম্য।
কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মনে করেন, ভারতে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এসেছে, যার প্রতিফলন বাংলাদেশেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে তিনি এটিকে বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির লড়াই হিসেবে দেখছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, দুই দেশের সাধারণ মানুষই শেষ পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ বজায় রাখবে।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের যে চরম অবনতি ঘটেছিল, তার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ভারতীয় পণ্য বয়কট, ভিসা কার্যক্রম বন্ধ এবং মিশনে হামলার মতো ঘটনায় সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। তবে বর্তমানে উভয় দেশের সরকারের তরফ থেকে দৃশ্যমান সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার ‘নিউ রিলেশন’ বা নতুন সম্পর্কের বার্তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এই পরিবর্তনের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বাংলাদেশের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলো যে কোনো সরকারের সঙ্গেই দক্ষতার সঙ্গে ডিল করতে হবে এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার রদবদল বাংলাদেশের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না।
পশ্চিমবঙ্গের এই ক্ষমতার পালাবদল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। মমতা ব্যানার্জীর হারের পাশাপাশি নন্দীগ্রামে খোদ মমতার পরাজয় এবং শুভেন্দু অধিকারীর জয় এই পরিবর্তনের গভীরতা স্পষ্ট করে দিয়েছে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ওপর পড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।