দুপুর গড়িয়ে পড়ার পর পরই পদ্মার পাড়জুড়ে নারী পুরুষের ভিড়। নৌকা বাইচ দেখা বলে কথা। কেউ নদীর পাড়ে কেউ নৌকায় নদীর ভেতরে। পদ্মার বুকে উত্তাল তরঙ্গ। কাঁসর-ঢোলের সঙ্গে মাঝির সুর। রোদের আলোয় ঝলসে ওঠা বৈঠার কসরত। এভাবেই হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য আর গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে জাগ্রত রাখতে রাজশাহীর বাঘায় বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও লোকজ গ্রামীণ মেলা। আগামী শনিবার পর্যন্ত পদ্মার তীরে চলবে তিন দিনব্যাপী এই প্রাণের উৎসব।
উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের বেঙ্গাড়ী বাজারসংলগ্ন পদ্মা নদীতে বাইচের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, এবারের প্রতিযোগীদের উৎসাহিত করতে রাখা হয়েছে এক লাখ টাকার আকর্ষণীয় প্রাইজমানি।
প্রথম দিন বৃহস্পতিবার নৌকা বাইচ মেলার উদ্বোধন করেন রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এস এম সালাউদ্দিন আহমেদ শামীম সরকার। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এমপি আবু সাইদ চাঁদ পুত্র রাকিবুল হাসান অলিভ। প্রথম দিন বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেও নৌকা বাইচ দেখতে পদ্মার পাড়ে জড়ো হয় হাজারো নারী-পুরুষ। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার ও দর্শনার্থীদের কমতি ছিল না।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে বাঘা, চারঘাট, লালপুরসহ আশপাশের গোটা অঞ্চলে বইছে বাঁধভাঙা উৎসবের আমেজ।যেন এক মিলন মেলা। তিন দিনব্যাপী আয়োজনে ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে’ গানের তালে তালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জলতরঙ্গে নৌকা নিয়ে ছোটেন মাঝিমাল্লারা। নদীর দুই তীরে হাজারো মানুষ সাক্ষী হয়ছেন এই বীরত্বগাথার।
আয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নদীসংলগ্ন এলাকায় বসেছে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মাটি আর মাটির গন্ধে মাখানো লোকজ মেলায় স্থান পেয়েছে মৃৎশিল্প, কাঁসা-পিতল, গৃহস্থালি সামগ্রী থেকে শুরু করে শিশুদের মনকাড়া হরেক রকমের খেলনা ও মুখরোচক মিষ্টির পসরা।
নৌকা বাইচ দেখতে আসা বাজু বাঘা গ্ৰামের অবসর প্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুল হালিম তার স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে সাথে নিয়ে এসেছেন নৌকা বাইচ মেলায়। তিনি জানালেন গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে জাগ্রত রাখতে নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তার মতে নদী মরে যাওয়ায় অনেক স্থানে সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, ২০২৩ সালের পর দীর্ঘ তিন বছর বিরতি দিয়ে আবারও বর্ণিলভাবে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের ঘরে ঘরে এখন স্বজনদের মেলা। সরেরহাট গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী জামির উদ্দিন সরকার আনন্দের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘নৌকাবাইচ দেখতে বাড়িতে মেয়ে-জামাইসহ আত্মীয়স্বজনরা এসেছে। এ উৎসব আমাদের গ্রামে এক অপূর্ব মিলনমেলার রূপ নেয়।’
মেলার স্থায়ী ও অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা জানান, এ মেলায় নারী ও শিশুদের উপস্থিতি থাকে সবচেয়ে বেশি। বছরের এই নির্দিষ্ট দিনগুলোতে বেচাকেনা ভালো হওয়ায় বাড়তি আয়ের মুখ দেখেন তারা।
আয়োজক কমিটির সভাপতি তোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া শিকড়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখা। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এটি এক ঐতিহাসিক জনসমাগমে রূপ নিয়েছে।’
প্রতিযোগিতার সার্বিক তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় রয়েছেন বিএনপি নেতা মাসুদ করিম টিপু, জাহিদুল ইসলাম স্বপন ও ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম জনি। তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত থাকছেন। আয়োজনের শেষ দিন রাজশাহী -৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেরাজুল হক জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে মেলা ও প্রতিযোগিতা সম্পন্ন করতে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ এবং গ্রাম পুলিশের সমন্বয়ে কঠোর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।