সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকা
ফন্টসাইজ A- A A+
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
আইন ও আদালত

আইন ও নির্দেশনা কাগজে-কলমে

দুদকের মামলায় ধীরগতি, বিচারাধীন ৮ হাজার

স্বদেশ বানী ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯-১০-২০২৬, ০৫:০৯ PM
০ বার পঠিত
দুদকের মামলায় ধীরগতি, বিচারাধীন ৮ হাজার

বর্তমানে সারা দেশের আদালতগুলোতে দুদকের করা প্রায় ৮ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন ৩ হাজার ৪৩৮টি মামলা। আর সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে রয়েছে আরও ৪ হাজার ৮১৬টি মামলা। দুদক আইন অনুসারে ১২০ দিনে তদন্ত শেষ করা ও ৬০ দিনে বিচার নিষ্পত্তি করার বিধান রয়েছে। কিন্তু সেই বিধান মানা হচ্ছে না। মামলার তদন্ত ও বিচার শেষ করতে বছরের পর বছর এমনকি যুগ পার হয়ে যাচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের বিধান অনুযায়ী, বিচার শেষ করা গেলে দুর্নীতির বিচারে গতি আসবে। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা একেবারেই কমে যাবে। দুর্নীতিবাজরা দ্রুতই সাজার মুখোমুখি হবে। এতে করে সমাজে একটা বার্তা যাবে। দুর্নীতি কমতে শুরু করবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ধারা ২০ (ক)-এ বলা আছে, ‘ক্ষমতা প্রাপ্তির তারিখ হতে অনধিক ১২০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অপরাধের তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। তবে উল্লিখিত সময়সীমার মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন না হওয়ার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনক্রমে কেবল বিশেষ ও ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কারণ উল্লেখ সাপেক্ষে আরও অনধিক ৬০ কর্মদিবস সময় বৃদ্ধি করা যাবে। এ সময়সীমার মধ্যেও তদন্ত করতে ব্যর্থ হলে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করে ৯০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার (ব্যর্থ) বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগে বিধি-বিধান অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ কিন্তু নিজেদের আইনই মানছে না দুদকের কর্মকর্তারা। মামলার পর তদন্ত শেষ হচ্ছে না নির্দিষ্ট সময়ে। অনেক মামলার তদন্ত শেষ করতে বছর পার হচ্ছে। এতে করে দুর্নীতিবাজদের মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা যাচ্ছে না।

আবার দুদকের মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে ১৯৫৮ সালের ‘দ্য ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’ অনুযায়ী বিশেষ জজ আদালত স্থাপন করে সরকার। এই আইনের ৬(ক) ধারা অনুযায়ী, দুর্নীতি মামলা আমলে নেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা। কিন্তু ৬০ দিন তো দূরের কথা, এক যুগেও অনেক মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না।

এ অবস্থায় ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর একটি সার্কুলার জারি করে দুদকের মামলার বিচারের ক্ষেত্রে ৬০ দিনের বিধান পালনের নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। ওই সার্কুলারে বলা হয়, ‘বিভাগীয় বিশেষ জজ ও বিশেষ জজ আদালতগুলোর দুর্নীতির মামলা আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবং কাঙ্ক্ষিত হারে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এ অবস্থায় সব জেলা ও দায়রা জজ এবং মহানগর দায়রা জজকে দুর্নীতির মামলাগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হলো। আইনে উল্লিখিত বিধান ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বছরের পর বছর আদালতে বিচারের জন্য ঝুলে রয়েছে দুর্নীতির মামলা।

কেস স্টাডি-১

বিসিএস প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের আলোচিত নাম সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অবসরপ্রাপ্ত গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবন। আবেদ আলী, তার স্ত্রী ও ছেলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পৃথক তিনটি মামলা করে দুদক। সিয়ামের বিরুদ্ধে করা মামলাটির তদন্ত শেষ করতে দুদকের লেগে যায় ১ বছর। তদন্ত শেষে দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর এ মামলায় চার্জশিট জমা দেন। মামলাটি আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনে শুনানির জন্য রয়েছে। তবে এখনো আবেদন আলী ও তার স্ত্রীর মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি দুদক।

কেস স্টাডি-২

১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর মামলা দায়ের করেন দুদকের উপ-পরিচালক হাফিজুল ইসলাম। এ মামলার তদন্ত শেষ করতে দুদকের লেগে যায় প্রায় এক বছর। তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ নভেম্বর চার্জশিট জমা দেন দুদকের একই কর্মকর্তা হাফিজুল। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালতে আগামী ১১ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য রয়েছে।

কেস স্টাডি-৩

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের (ইউসিবিএল) ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী (বিদেশে পলাতক) ও তার স্ত্রীসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে দুদকের উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমান খান বাদী হয়ে চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ে-১ মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করতে দুদকের সময় লাগে সাড়ে ৫ মাস। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি মামলাটি তদন্ত করে ৩৬ জনের চার্জশিট দেয় দুদক। বর্তমানে মামলাটি চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মিজানুর রহমানের আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৫ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে।

কেস স্টাডি-৪

৫ কোটি ২৮ লাখ ৭৫ হাজার ৯৩৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ‘ছাগলকাণ্ডে’ আলোচিত এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তা (সদস্য) মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর মামলা দায়ের করে দুদক। এ মামলার তদন্ত শেষ করতে দুদকের সময় লাগে প্রায় ১৪ মাস। চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন দেয় দুদক। মামলাটি বর্তমানে ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ বি. এম. তারিকুল কবীরের আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

কেস স্টাডি-৫

বাপেক্সের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) মিসেস নাজমা বেগমের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মামলা দায়ের করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আতাউর রহমান সরকার। মামলায় আসামির বিরুদ্ধে ৮৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫০৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ৪০ লাখ ৬১ হাজার ১৯৩ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি তদন্ত করতে দুই বছর সময় লাগে দুদকের।

২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তদন্ত শেষে মামলাটির চার্জশিট দাখিল করেন দুদকের একই কর্মকর্তা আতাউর রহমান। পরবর্তীতে দেড় বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও মামলাটির চার্জ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু করা যায়নি। বারবার চার্জ শুনানির তারিখ পেছানো হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর মামলাটির চার্জ শুনানির দিন ছিল। তবে আসামি অনুপস্থিত থেকে সময় চেয়ে আবেদন করেন। আদালত তা মঞ্জুর করে আগামী ২৮ অক্টোবর চার্জ শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন। ৬০ দিনে বিচার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

‘আইন বিশেষজ্ঞ ও দুদক-সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন’ আবেদপুত্র সিয়ামের মামলায় দুদকের পক্ষে লড়ছেন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) দেলোয়ার জাহান রুমী। ৬০ দিনে মামলার বিচার শেষ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে তদন্তে সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের অবস্থান নির্ণয়, অপরাধারে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সম্পৃক্ততা নির্ণয় করা, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করাসহ সম্পদ জব্দ, বিদেশে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ও অবস্থান শনাক্ত, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান পরিচালনা ইত্যাদি। তা ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে দুদক যখন কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা, সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ ও কাগজপত্র তলব করে, তখন তারাও ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করেন। এ জন্য নির্দিষ্ট সময়ে তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। তবে আপিল বিভাগ বলেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না করলে শুধু সেই কারণে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম বাতিল হয়ে যাবে না।’

তদন্ত নির্দিষ্ট সময়ে শেষ না হওয়ার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্র পক্ষ থেকে আমরা চাই মামলার বিচার যেন দ্রুত শেষ হয়। কিন্তু আসামি পক্ষ থেকে বারবার চার্জ শুনানি পেছানোর আবেদন, সাক্ষীকে জেরা করতে বারবার সময়ক্ষেপণে বিচার শেষ করতে দেরি হয়। আর যদি হাইকোর্টে মামলায় স্থগিতাদেশ থাকে, তা হলে ৬০ দিনে কীভাবে বিচার শেষ হবে? সুতরাং, এগুলোর কোনোটাই ম্যানডেটরি (বাধ্যতামূলক) প্রভিশন নয়।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়ার সমস্যা নতুন নয়। দুদকের জন্মলগ্ন থেকেই সমস্যা। সাম্প্রতিক সময়ে দুদকে অভিযোগ, তদন্ত ও মামলার কাজের চাপও বেড়েছে। বিগত কমিশন পদত্যাগ করার পর গত দুই বছর দুদক স্থবির অবস্থায় ছিল। স্থবিরতার ফলেও তদন্ত শেষ না হওয়া অন্যতম একটা কারণ। পাশাপাশি দুদকের সক্ষমতার একটা ঘাটতি আছে। জনবল ঘাটতি রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘একজন কর্মকর্তার হাতে অনেকগুলো মামলার তদন্তভার রয়েছে। এতে করে সঠিক সময়ে সব মামলার তদন্ত শেষ করা যাচ্ছে না। এর ফলে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা কিন্তু একটা সুবিধা পেয়ে যায়। এভিডেন্স সরিয়ে ফেলা বা তথ্য-প্রমাণ পরিবর্তন করার এক ধরনের সুযোগ তৈরি হয়। এ ছাড়া দুদকের কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আমলাতান্ত্রিক প্রভাব। সার্বিকভাবে দুদকের ওপর যে প্রত্যাশা তা পূরণে ঘাটতি চলমান আছে। তবে জনগণ আশা করবে, দুদকের নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের তুলনায় গতিশীলতা বাড়বে। প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারবে। তবে সমস্যাগুলো হঠাৎ করেই সমাধান হয়ে যাবে এ আশা করাটা কঠিন, সময়সাপেক্ষ।’

৬০ দিনে দুর্নীতির মামলার বিচার শেষ করতে না পারার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এটা খুব বাস্তবসম্মত বিধান না। তবে এটা আদর্শ, প্রত্যাশার জায়গা থেকে ঠিক আছে। দুর্নীতির মামলা আমাদের মতো পৃথিবীর সব দেশেই জটিল। এ ছাড়া আমাদের বিচারিক প্রক্রিয়াতেও দুর্বলতা আছে। দুদকের কাজ মামলা কোর্ট পর্যন্ত বিচারের জন্য যাওয়া। এরপর সেটা আদালতের ওপর নির্ভর করে। আমাদের দেশে মামলার তুলনায় বিশেষ আদালত নেই। যে আদালতগুলো আছে সেখানে গতিশীলতার ঘাটতি আছে। প্রত্যাশা মামলাগুলো যেন দ্রুত শেষ হয়।’


লিংক কপি হয়েছে