সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকা
ফন্টসাইজ A- A A+
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
logo

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়নি ১ বছরেও


স্বদেশ বানী ডেস্ক published:  ২২ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়নি ১ বছরেও

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে যে গ্রেনেড হামলা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশ, সেই মামলার মামলায় আপিল বিভাগের সংক্ষিপ্ত রায়ের প্রায় এক বছর হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়নি। গতবছরের সেপ্টেম্বের সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৬ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ৪৯ আসামির সবাইকে খালাস দেন।

এই মামলার আইনজীবীরা জানান, রাজনৈতিক কারণেই তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাদের আসামি করে সাজা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ তাদের নির্দোষ ঘোষণা করেন।

মামলার নথি অনুসারে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়। একের পর এক বিস্ফোরণে ঘটনাস্থল পরিণত হয় রক্তাক্ত। নিহত হন ২৪ জন। আহত হন কয়েকশ মানুষ। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন এবং অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

এই হামলার পর মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা হয়। কিন্তু মামলা হওয়ার পর থেকেই তদন্তের গতিপথ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়। এক পর্যায়ে তদন্ত নতুন করে শুরু হয় এবং মামলাটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক সহিংসতার মামলাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

দীর্ঘ বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। দুই মামলায় ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু। যাবজ্জীবনপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহসচিব ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলা যায় হাইকোর্টে। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর আসে মামলার দ্বিতীয় বড় মোড়। হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে সব আসামিকে খালাস দেন। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। পরে আপিল বিভাগ সেই আবেদন গ্রহণ করে শুনানির পর ৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় সদস্যের বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে দেন। ফলে হাইকোর্টের দেওয়া খালাসের রায় বহাল থাকে।

জোরপূর্বক সাক্ষীদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া, যে সম্পুরক চার্জশিটের ওপর ভিত্তি করে বিচারিক আদালত রায় দিয়েছিল সেটিকে অবৈধ ঘোষণা এবং হামালার তথ্য প্রমানের যথেষ্ট অভাব থাকায় প্রথম রায়কে ত্রুটিপূর্ণ ঘোষণা করে তা বাতিল করে দেন উচ্চ আদালত।

আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী এসএম শাহজাহান বলেন, ‘মামলাটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তদন্তে হস্তক্ষেপের বিষয় উঠে এসেছে। কোনও প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না। এ মামলায় অনেক রাজনৈতিক ফ্লেভার মেশানো ছিল। রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে যে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না, এই মামলাই তার প্রমাণ’।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মোহাম্মাদ আলী বলেন, স্পষ্ট বোঝা যায় দ্বিতীয় তদন্ত, দ্বিতীয় চার্জশিটে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নাম দিয়ে বিচার শুরুটা পুরোটাই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিচার কীভাবে পাবে, এটা তো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র অনেক আইনজীবীরা মনে করেন, হামলায় অনেকে হাতাহত হলেও প্রকৃত আসামিদের আড়াল করে ভুল তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ায় এখন ভুক্তভোগীদের পরিবারও বিচারবঞ্চিত।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রায়ে দণ্ডিত আসামিরা খালাস পেয়েছেন। কিন্তু খালাসের অর্থ এই নয় যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। ওই হামলায় ২৪ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা এই মামলার বিচারিক ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, যে বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে একসময় সাজা দেওয়া হয়েছিল, সেই বিচার অবৈধ ও বাতিল হওয়ার পর হামলার প্রকৃত দায়ীদের বিচারের পথ কী? আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হলে এ প্রশ্নের আইনি ব্যাখ্যা আরও পরিষ্কার হতে পারে বলে মনে করেন আইনজীবীরা।