স্বদেশ বানী ডেস্ক published: ০৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

‘তোমরা কিছু করো না কেন? মারো না কেন ওদের, চড়াও হতে দাও কেন ওদের...’, জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের দমন করতে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে ফোনে এমন নির্দেশনা দেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শুনানির দ্বিতীয় দিনে ট্রাইব্যুনালে এমন একটি কল রেকর্ড দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, এটি তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মধ্যকার কথোপকথন।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এটি প্রমাণক হিসাবে উপস্থাপন করা হয়।
আদালতে উপস্থাপিত অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, সাদ্দাম হোসেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রীকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি, জমায়েত ও সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে অবহিত করছেন। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির কথা শুনে ওবায়দুল কাদের অনেকটা উত্তেজিত হয়ে বলছেন, ‘তোমরা কিছু করো না কেন? মারো না কেন ওদের? চড়াও হতে দাও কেন ওদের?’
জবাবে সাদ্দাম হোসেন তাদের ‘নিষেধ করা হয়েছে’ জানালে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তোমরা বললা আজকে থেকে হালকা হয়ে যাবে সব। কই হালকা হইল? জমায়েত মানে এখানে জামায়াত আর বিএনপি যোগ হইছে।’ তখন সাদ্দাম বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার নির্দেশ’ পেলে আমরা সেটি করতে পারব।’
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল ও লেখক অধ্যাপক জাফর ইকবালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে একটি খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেলসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় মাকসুদ কামাল, জাফর ইকবালসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
যুক্তিতর্কে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের একটি ফোনালাপও তুলে ধরে প্রসিকিউশন।
শুনানি শেষে কাদের ও সাদ্দামের কথোপথন প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, ২০২৪ সালের ১১ জুলাইয়ের ওই কথোপকথনের রেকর্ডটি সিআইডির তরফে ফরেনসিক করে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে অধীনস্থ কাউকে ‘পিটাও না কেন ওদের, মারো না কেন, বাড়তে দাও কেন’-এই ধরনের নির্দেশ দেওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে স্পষ্টত ‘উসকানি’ (ইনসাইটমেন্ট) দেওয়ার অপরাধ। প্রসিকিউটর বলেন, ‘সামনে বলছেন প্রতিরোধ; কিন্তু ফোনে এবং কার্যকরভাবে ওনারা আসলে প্রতিরোধ না, আক্রমণের কথাই বলেছেন।’
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম দাবি করেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ‘রাজাকার’ মন্তব্যের পর ওবায়দুল কাদেরের ‘উসকানিতেই’ ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেলে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতার ওপর ‘সশস্ত্র’ হামলা চালায় ছাত্রলীগের কর্মীরা। জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও ‘উসকানিদাতা’ হিসাবে ওবায়দুল কাদেরের নাম আসার কথা জানান প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হামলা ও হত্যাকাণ্ড কেবল একক নির্দেশে হয়নি, বরং এটি ছিল আওয়ামী লীগের একটি ‘সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত’।
এ মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও পলাতক অন্য ছয় আসামি হলেন-আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। ২ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর যুক্তিতর্ক শুরু হয়। রোববার এ মামলার পরবর্তী যুক্তিতর্ক শুনানি হবে।
এবার আসামি মাকসুদ কামাল ও জাফর ইকবাল : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে একটি খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। প্রতিবেদনটি যাচাই-বাছাই শেষে শিগগিরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
উল্লেখযোগ্য আসামি হলেন-শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল, সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। প্রসিকিউশন জানায়, এ ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করে তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। বর্তমানে তা পর্যালোচনা চলছে। এরপর ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হবে।