সারোয়ার হোসেন,তানোর published: ০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম

রাজশাহী -১( তানোর -গোদাগাড়ী) আসনটি ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। এবারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম জিয়ার সামরিক সচিব এবং প্রয়াত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ছোট ভাই মেজর জেনারেল (অব) শরীফ উদ্দীন। অপর দিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কেন্দ্রীয় জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমীর সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। এই নির্বাচনে তানোর উপজেলায় দুই ভিআইপি বা হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারেরা। কারন বিগত স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর থেকে দুই প্রার্থী উপজেলার গ্রাম গঞ্জে ও পাড়া মহল্লায় নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। অবশ্য বরাবরের মত এআসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু জামায়াত প্রার্থী এবং দলীয় নেতাকর্মীরা কোন ভাবেই ছাড় দিতে রাজি না। উভয় দলের নেতারা বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
জানা গেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল কাংখিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এনির্বাচনে সারা দেশের ন্যায় তানোরে বিএনপি ও জামায়াতে প্রার্থীর মধ্যে হবে মুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। গত জানুয়ারি মাসের ২২ তারিখ থেকে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক ভাবে নির্বাচনী প্রচারণা। ২২ জানুয়ারি থেকে বিরামহীন প্রচারণা চালাচ্ছেন দুই প্রার্থী ও নিজ নিজ দলের নেতাকর্মীরা। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে প্রচারণা।
বিএনপির দলীয় সুত্র জানায়, বিগত ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম বারের মত ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রয়াত ব্যারিস্টার আমিনুল হক। তিনি প্রথম বারের মত এমপি নির্বাচিত হয়ে সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পেয়েই অবহেলিত তানোরে উন্নয়নের জোর বয়ে দেন। রাস্তাঘাট, ব্রীজ কার্লভাট, স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে সর্বত্রই উন্নয়ন করেন। যার কারনে ১৯৯৬ সালে পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন। তবে ১৯৯৬ সালে আ”লীগ সরকার গঠন করে। ২০০১ সালে বিএনপি জামায়াতসহ চারদলীয় জোট থেকে পুনরায় এমপি প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন ব্যারিস্টার আমিনুল হক। এমপি নির্বাচিত হয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। উপজেলার বাকি উন্নয়ন কাজগুলো শেষ করেন। ২০০৮ সালে নির্বাচনে মামলার কারনে ভোটে অংশ নিতে পারেনি ব্যারিস্টার আমিনুল হক। তার ভাই পুলিশের সাবেক আইজিপি ড এনামুল হক ধানের শীষ নিয়ে আ”লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। এরপরে ২০১৪ সালে এক তরফা নির্বাচন করে স্বৈরাচার হাসিনা সরকার। বিগত ২০১৮ সালের নির্বাচনে পুনরায় জোটের প্রার্থী হয়ে ব্যারিস্টার আমিনুল হক ধানের শীষ নিয়ে ভোট করেন। কিন্তু ওই নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে এবং ভোটের দিন সকাল থেকে শুরু হয় কেন্দ্রে কেন্দ্রে মারপিট। এরপরে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি দেন। বিগত ২০২৪ সালের নির্বাচন হয় আমি ডাবি। সে নির্বাচন বিএনপি জামায়াত জোট বর্জন করেন।
ভোটারেরা জানান, ভোটে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কারন দুই প্রার্থী সহ দলের নেতাকর্মীরা ব্যাপক ভাবে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে। প্রথম অবস্থায় জামায়াত একচেটিয়া ভাবে এগিয়ে ছিল। কারন বিএনপির মাঝে লবিংগ্রুপিং বেশি ছিল। বিশেষ করে বিএনপি থেকে মনোনয়নের দাবি তুলেছেন এডভোকেট সুলতানুল ইসলাম তারেক। তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে এবং পরিবর্তনের দুই উপজেলায় রাস্তা অবরোধ মশাল মিছিল সহ মারপিট ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মত ঘটনা ঘটেছিল। একারনে তারেক অনুসারীরা ভোটের মাঠে তেমন ভাবে ছিল না। কিন্তু দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন তারেক। শুধু প্রতয়াহার না প্রার্থী শরীফ উদ্দীনের সাথে এক মঞ্চে সভা করছেন তারেক। এছাড়াও তারেক বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করছেন। এক কাতারে চলে আসে বিএনপি। ধানের শীষ কে বিজয়ী করার জন্য তারেক অনুসারীরা ভোটের মাঠে গণসংযোগ সহ নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যার কারনে পাল্টে গেছে ভোটের মাঠ। দিনের দিন ধানের শীষের গণজাগরণ শুরু হয়েছে। তারেক ভোটের মাঠে থাকলে ধানের শীষের প্রার্থী কে চরম বেকায়দায় পড়তে হত। নিশ্চিত পরাজয় বরণ করত হত। এসুযোগে দাঁড়িপাল্লা বিজয়ের দারপ্রান্তে চলে যেত। তারাও আশা করেছিল যেভাবেই হোক তারেক যেন ভোটের মাঠে থাকে। কিন্তু জামায়াতের সেই আশায় গুড়েবালি পড়েছে।
তানোর পৌর যুবদলের যুগ্ন আহবায়ক নুর হাসান মাহমুদ রাজা জানান, তানোর সদরে প্রথম দিকে বিএনপির অবস্থান কিছুটা খারাপ ছিল। সবাই একসাথে গত কয়েকদিন ধরে ডোর টু ডোর ও মোড়ে মোড়ে এবং মহিলাদের মাঝে গণসংযোগ করার পর থেকে বদলে যেতে শুরু করেছে ভোটের মাঠ। আসলে এআসন বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত। এখানে ধানের শীষ ছাড়া অন্য দলের বিজয় অর্জন করা কষ্টকর ব্যাপার। কারন প্রয়াত ব্যারিস্টার আমিনুল হকের প্রতি দলমত নির্বিশেষে একটা আবেগ ভালোবাসা আছে। তিনি না থাকলেও তার ছোট ভাই প্রথমবারের মত ভোটের মাঠে অংশ নিচ্ছেন। তিনিও ভোটের মাঠে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। যার প্রমান গত সোমবার বিকেলে তানোর পৌর বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের আয়োজনে বিশাল নির্বাচনী মিছিল এবং থানা মোড়ে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই মিছিলে দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি গ্রাম থেকে সাধারণ ভোটেরা অংশ গ্রহণ করেন।
সাবেক ছাত্র দলের সভাপতি আব্দুল মালেক মন্ডল জানান, এআসন বিএনপির দূর্গ। তবে প্রতিপক্ষ কে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নাই। দলের মধ্যে মান অভিমান থাকার কারনে অনেকে ভোটের মাঠে নামছিলনা। তবে এখন আর সেই সমস্যা নেই। সবাই কোমর বেধে ভোটের মাঠে কাজ করছেন। আশা করছি ধানের শীষের প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করবেন।
জামায়াত নেতারা জানান, বিগত ১৯৮৬ সালে প্রথম বারের মত এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। এরপরে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে পরাজিত হন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন প্রয়াত ব্যারিস্টার আমিনুল হক। তবে এবারে নির্বাচন অনেকটা ভিন্ন মাত্রায় হচ্ছে। কারন গত ২০২৪ সালে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান স্বৈরাচার সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। রাজনীতিতে পাল্টে যায় হিসেব নিকেশ। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ভোট যুদ্ধে নামেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি ভোটের মাঠে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর আশার কারনে নতুন রুপে সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই জাতীয় সনদে সব রাজনৈতিক দল সাক্ষর করলেও বিএনপির মত বৃহত্তর দল হ্যাঁ ভোট নিয়ে তেমন প্রচারপ্রচারণা করেননি। অথচ জামায়াতের প্রার্থী সহ নেতাকর্মীরা প্রতিটি মুহূর্তে হ্যাঁ ভোটে সিল মারতে ভোটারদের আহবান জানাচ্ছেন। এছাড়াও ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার গোদাগাড়ী পৌর এলাকার মহিশালবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন আমীরে জামায়াত ডা: শফিকুর রহমান। সে জনসভায় ব্যাপক লোক সমাগম হবে। জনসভার পরে আশা করছি ভোটের মাঠের চিত্র বদলে যাবে।
উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আলমগীর হোসেন জানান, গত ২০২৪ সালে ৩৬ জুলাই ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার হাসিনা ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পাল্টে যায় দেশের রাজনীতি। জুলাই চেতনার রাজনীতি বাস্তবায়নে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ ১১ দলীয় জোট। রাজশাহী -১ আসনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট যুদ্ধে নেমেছেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। গত প্রায় ১৭ মাস ধরে বিভিন্ন ভাবে ভোটের মাঠে গণসংযোগ সহ সভা সমাবেশ করা হচ্ছে। জনগণের ব্যাপক সাড়া দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে। মরিয়ে হয়ে আছেন নারী পুরুষ সহ তরুণ ও অন্য ধর্মের ভোটেরা। সবার একটাই কথা সব দলকে দেখা হয়েছে। কিন্তু জামায়াত কে দেখা হয়নি। সুতরাং হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে সেটা যেমন সঠিক, তেমনি ভাবে দাঁড়িপাল্লা অনেক এগিয়ে আছে। আশা করছি ব্যালটের মাধ্যমে আপামর জনতা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে ভূমিধস বিজয় ঘটাবে। এছাড়াও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে সিল মারার জন্য আহবান জানান তিনি।
উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আখেরুজ্জামান হান্নান জানান, এআসন বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত। কারন এআসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে অবহেলিত বরেন্দ্র অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন প্রয়াত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক। তার ছোট ভাই প্রথমবারের মত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট করছেন। সুতরাং ধানের শীষ বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করবেন। শুধু তাই না উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্রে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জানা গেছে, তানোর উপজেলায়, ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৮০ ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৮৪ হাজার ৫৪৬ জন এবং নারী ভোটার ৮৭ হাজার ৩২৪ জন। কেন্দ্র রয়েছে ৬১ টি ও বুথের সংখ্যা ৩৪০ টি। গোদাগাড়ী উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯১০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫৩২ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৭৫ জন। দুই উপজেলা মিলে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ জন।